শিরোনাম:
এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষকদের দীর্ঘশ্বাস:
এমরানা বেগম
- আপডেট সময় : ০৪:১৮:০৫ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬ ২০০ বার পড়া হয়েছে
এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষকদের দীর্ঘশ্বাস:
এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষকদের ৪% অতিরিক্ত কর্তনের বিপরীতে অতিরিক্ত সুবিধা প্রদান ও পেনশনের নামে বছরের পর বছর অপেক্ষা
একটি দেশের মেরুদণ্ড গড়ে তোলেন শিক্ষকরা। অথচ আমাদের দেশের বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের জীবনের শেষ প্রান্তের দিনগুলো কাটছে চরম অনিশ্চয়তা আর অপমানের মধ্য দিয়ে। জীবনের সোনালী সময়টুকু আলো ছড়াতে ছড়াতে পার করে দেওয়ার পর, অবসরে গিয়ে নিজের জমানো টাকাটুকু পাওয়ার জন্য শিক্ষকদের বছরের পর বছর টেবিলে টেবিলে ঘুরতে হয়। এর ওপর যোগ হয়েছে অতিরিক্ত অর্থ কর্তনের বোঝা।
গত ১৩ জুন ২০২৬ তারিখে বাংলাদেশ বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারী সমন্বিত ফোরাম-এর ব্যানারে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে শিক্ষকরা যে মানববন্ধন করেছেন, তা কেবল একটি প্রতিবাদ সমাবেশ ছিল না; তা ছিল হাজার হাজার শিক্ষকের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও দীর্ঘশ্বাসের বহিঃপ্রকাশ। আইনি জয় বনাম আপিলের দেয়াল ঘটনার সূত্রপাত বেসরকারি শিক্ষকদের বেতন থেকে অবসর ও কল্যাণ সুবিধার জন্য অতিরিক্ত ৪% (মোট ১০%) টাকা কর্তনকে কেন্দ্র করে।
মহামান্য আদালত শিক্ষকদের পক্ষে রায় দিয়ে এই ৪% অতিরিক্ত কর্তনের জন্য আনুপাতিক হারে অতিরিক্ত সুবিধা প্রদানের কথা বলেন। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয় হলো, সরকারপক্ষ এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে। সম্প্রতি আপিল করার কথা শুনার পর শিক্ষকরা তীব্র হতাশায় নিমজ্জিত হয়েছেন।

যে টাকা শিক্ষকের নিজের অধিকার, তা কেটে নেওয়ার বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ের পরও যখন শিক্ষকরা বঞ্চিত হন, তখন জাতির শিক্ষাগুরুদের রাজপথে এসে দাঁড়ানো ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না। অবসরের পর ৪-৫ বছরের অপেক্ষা: এক অমানবিক বাস্তবতা। একজন শিক্ষক যখন অবসরে যান, তখন তাঁর আয়ের একমাত্র উৎস হয় এই অবসর ও কল্যাণ তহবিলের টাকা। কিন্তু বর্তমান ব্যবস্থায় এই টাকা হাতে পেতে একজন শিক্ষকের ৪ থেকে ৫ বছর পর্যন্ত সময় লেগে যাচ্ছে! ভাবা যায়, একজন মানুষ চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর দীর্ঘ ৪-৫ বছর কোনো আয় ছাড়াই পরিবার চালাচ্ছেন? এই দীর্ঘ অপেক্ষায় কত শিক্ষক বিনা চিকিৎসায় মারা যাচ্ছেন, কত শিক্ষকের সন্তানের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, তার হিসাব কি রাষ্ট্র রাখছে?
নিজের উপার্জিত টাকা পাওয়ার জন্য একজন প্রবীণ শিক্ষককে কেন বৃদ্ধ বয়সে ধুঁকে ধুঁকে মরতে হবে? শিক্ষকদের পাশে আইনি অভিভাবক এই কঠিন সময়ে শিক্ষকদের পাশে দাঁড়িয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের বিশিষ্ট আইনজীবী অ্যাডভোকেট সিদ্দিক উল্লাহ মিয়া। মানববন্ধনের পর শিক্ষকরা তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করলে তিনি শিক্ষকদের এই ন্যায়সঙ্গত দাবির প্রতি পূর্ণ একাত্মতা প্রকাশ করেন। তিনি শিক্ষকদের পক্ষে অত্যন্ত জোরালো বক্তব্য রেখেছেন এবং আশ্বস্ত করেছেন যে, ভবিষ্যতেও শিক্ষকদের এই আইনি লড়াইয়ে তিনি সবসময় পাশে থাকবেন। আইনজীবীদের এই ধরনের নৈতিক ও আইনি সমর্থন শিক্ষকদের মনোবলকে টিকিয়ে রেখেছে। আমাদের চাওয়া শিক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন বা স্মার্ট বাংলাদেশের স্বপ্ন তখনই সফল হবে, যখন শিক্ষকরা ক্লাসরুমে নিশ্চিন্ত মনে পড়াতে পারবেন। মাথার ওপর অবসরের পর না খেয়ে থাকার চিন্তা নিয়ে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা অসম্ভব।
আমরা সরকারের কাছে আকুল আবেদন জানাই:
১. মহামান্য আদালতের পূর্বের রায়কে সম্মান জানিয়ে ৪% টাকা অতিরিক্ত কর্তনের জন্য আনুপাতিকহারে অতিরিক্ত সুবিধা প্রদানের ব্যবস্থা করে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকের শেষ মাসের বেতনের সাথে অবসর ও কল্যাণ তহবিলের টাকা পরিশোধের ব্যবস্থা করা হওক। অথবা,
২. আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করে অবসর ও কল্যাণ ট্রাস্টের টাকা অবসরের সর্বোচ্চ ৩ মাসের মধ্যে প্রদানের স্থায়ী ব্যবস্থা করা হোক।
৩। প্রতি মাসের বেতনের সাথে শিক্ষকের জমাকৃত সর্বমোট টাকার পরিমাণ জানিয়ে দেয়া হওক।
৪। প্রতিমাসের এমপিও শিটে প্রত্যেকের অবসর ও কল্যাণের টাকার অন্তর্ভুক্তি চাই।
শিক্ষকদের রাজপথ থেকে ফিরিয়ে ক্লাসরুমের মর্যাদায় ফিরিয়ে আনা হোক। কারণ শিক্ষকের মুখে হাসি না থাকলে, জাতির ভবিষ্যৎ কখনোই উজ্জ্বল হতে পারে না।
এমরানা বেগম সহকারী প্রধান শিক্ষক, আমরাইদ ইয়াকুব আলী সিকদার উচ্চ বিদ্যালয়,কাপাসিয়া গাজীপুর। যুগ্ম নির্বাহী মহাসচিব, বাংলাদেশ বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারী ফোরাম ( বাবেশিকফো)















