শিরোনাম:
ষাটোর্ধ জীবন বড্ড বেমানান
নাজমা মনি
- আপডেট সময় : ০৬:১১:২৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩০ মে ২০২৬ ৪০ বার পড়া হয়েছে
ষাটোর্ধ জীবন বড্ড বেমানান
মা-বাবা যখন বোঝা হয়ে যান!
আমাদের সমাজের অধিকাংশ মা-বাবার কাছেই হয়তো ষাট বছরের পরের জীবনটা খুব একটা মানানসই মনে হয় না। কারণ এই বয়সে এসে জীবনের বাস্তবতা বদলে যেতে শুরু করে। দীর্ঘদিনের সঙ্গী স্বামী কিংবা স্ত্রী হঠাৎ করেই চিরবিদায় নেয়, শরীরজুড়ে বাসা বাঁধে নানান জটিল কঠিন অসুখ-বিসুখ, আর ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে একাকিত্ব।
একসময় যে সংসার হাসি-আনন্দে ভরপুর ছিল, বয়সের ভারে সেই সংসারে ক্রমশই কমতে থাকে কাছের মানুষদের সংখ্যা। সন্তানরা নিজেদের পরিবার, কর্মব্যস্ততা ও ব্যক্তিগত জীবনে এতটাই ডুবে যায় যে অনেক ক্ষেত্রেই মা-বাবার খোঁজ নেওয়ার সময়টুকুও হয়ে ওঠে না।
কেউ কেউ আবার অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল হওয়া সত্ত্বেও দূরে থাকা মা-বাবার অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অপারগতা প্রকাশ করে।
এমনকি ধর্মীয় উৎসব আনন্দ কিংবা বিশেষ দিনগুলোতেও খোঁজ খবর নেওয়ার প্রয়োজনও অনুভব করেন না।
ফলে উৎসব কিংবা বিশেষ দিনগুলোও বয়স্ক মা-বাবার কাছে হয়ে ওঠে কেবলই একটি সাধারণ দিনের সংখ্যা মাত্র!
আরও কষ্টের বিষয় হলো—কিছু সন্তান পরিণত বয়সে এসে বয়স্ক মা-বাবার দায়িত্ব নিতে অনাগ্রহী হয়ে পড়ে। কেউ কেউ দায়িত্ব নিলেও সেটি থাকে কেবলই আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ।
বৃদ্ধ মা-বাবার অসুস্থতা, ওষুধ, চিকিৎসা কিংবা প্রতিদিনের প্রয়োজনগুলো তখন অনেকের কাছেই বাড়তি ঝামেলা মনে হয়। অথচ এই মানুষগুলোর হাত ধরেই একদিন সন্তানেরা পৃথিবীকে চিনেছিল।
শৈশবে যে সন্তানরা “এইটা আমার মা”, “এইটা আমার বাবা” বলে ভাইবোনের সঙ্গে ঝগড়া করত, সময়ের ব্যবধানে তারাই কখনো কখনো সেই মা-বাবাকে নিজেদের জীবনের হিসাবের বাইরেই রেখে দেয়।
ছেলে ব্যস্ত স্ত্রী-সন্তান নিয়ে, মেয়ে ব্যস্ত স্বামী-সন্তান নিয়ে।
তাদের কর্মময় জীবন অফিস আদালত, সংসার, সন্তানদের লেখাপড়া—সবকিছুর ভিড়ে জন্মদাতা মা-বাবার জন্য যেন ক্রমেই ফুরিয়ে আসে সময়।

কিন্তু,,,
একবারও কি ভেবে দেখেছেন!—একদিন আমরাও বৃদ্ধ হবো আমাদেরও হবে ষাটোর্ধ জীবন।
আজ যাদের নিয়ে আমাদের এত ব্যস্ততা, এত স্বপ্ন আর এত আয়োজন, তারাও একদিন বড় হবে। তখন যদি তারাও আমাদের ঠিক একইভাবে অবহেলা করে?
যদি কোনো একদিন নিজেদের ব্যস্ততার অজুহাতে আমাদেরও দূরে সরিয়ে রাখে?
তখন কেমন লাগবে আমাদের?
তবে হ্যাঁ ব্যতিক্রমও আছে।
এখনও অনেক সন্তান আছেন যারা ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ ও মানবিকতা দিয়ে মা-বাবাকে আগলে রাখেন।
তাদের কাছে মা-বাবা কখনো বোঝা নয়, বরং আশীর্বাদ। কিন্তু দুঃখজনকভাবে সত্যি যে, এমন সন্তানের সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে আমাদের পরিবার সমাজ থেকে।
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো—সন্তান দূরে সরে গেলেও মা-বাবা কখনো সন্তানকে মন থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারেন না। সন্তান যতই ভুল ত্রুটি করুক না কেন বাবা-মায়ের ভালোবাসা ও মমতা থাকে চির অটুট।
ষাটোর্ধ বাবা মায়েরা তাদের সন্তানদের জন্য কিছু দিতে না পারলেও জায়নামাযে জোড়া হাতের ফাঁকে অস্পষ্ট উচ্চারণে রেখে যায় প্রাণভরা নিখাদ মঙ্গল প্রার্থনা।
তাদের চাওয়া পাওয়া গুলো ভীষণ সীমিত।
জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তারা কেবল অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষার প্রহর গুনে বসে থাকেন— দূরে থাকা প্রিয় সন্তানের মুখটি প্রাণভরে একবার দেখার জন্য।
কি নির্মম এই বাস্তবতা!
না পারেন কাউকে বলতে, না পারেন সহ্য করতে।
নিরবে নিভৃতে বুকের ভেতর কষ্টের পাহাড় চূড়ার উচ্চতা কেবলই বাড়তে থাকে।
এভাবেই হয়তো কোন একদিন পাহাড় সমান কষ্ট বুকে নিয়ে মাটি চাপায় পড়ে থাকবে মা বাবার নিথর দেহটা।
বুকভরা কষ্ট নিয়েই একসময় তারা পৃথিবী ছেড়ে চলে যান।
অতঃপর কিছুদিনের আফসোস আর কিছু অশ্রুজল বিসর্জন—এরপর আবারও সবাই ফিরে যায় নিজ নিজ ব্যস্ত জীবনে।
কিন্তু এই চক্র থেমে থাকে না, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলতেই থাকবে, ঠিক যেন বংশ’পরম্পরার মতই।
তাহলে কেন!
কেন আমরা মা-বাবার শেষ বয়সটুকু একটু সহজ করে তুলতে পারি না?
কেন তাদের ছোট ছোট ইচ্ছা, আবদার আর ভালো লাগাগুলোকে গুরুত্ব দিই না?
আমরা অনেকেই জান্নাতের আশায় ইবাদত করি, অথচ পৃথিবীতে থাকা জান্নাত সমতূল্য—মা-বাবার সেবাই যদি করতে না পারি, তবে সেই ইবাদতের পূর্ণতা কোথায়?
আমাদের প্রত্যেক সন্তানের উচিত মা-বাবাকে তাদের প্রাপ্য সম্মান দেওয়া, ভালোবাসা ও যত্ন দিয়ে শেষ সময় পর্যন্ত পাশে থাকা। কারণ পৃথিবীতে কোনো সম্পর্কই চিরস্থায়ী নয়।
একদিন আমাদেরও সমস্ত ব্যস্ততা, সাফল্য ও অর্জন ফেলে শূন্য হাতেই চলে যেতে হবে অনন্তের পথে।
তাই আসুন, মা-বাবাকে বোঝা নয়—আশীর্বাদ হিসেবে দেখি। তাদের মুখের হাসিটুকু সরিষা ফুলের ন্যায় ঝড়ে পড়ার পরিবর্তে বরং ধরে রাখার চেষ্টা করি।
মনে রাখবেন, আজ আমরা যা করছি, আগামী প্রজন্ম একদিন সেটিই আমাদের কাছে ফিরিয়ে দেবে।
মহান আল্লাহ সবাইকে হেদায়েত দান করুন এবং মা-বাবার প্রতি দায়িত্ব ও ভালোবাসা অনুভব করার তাওফিক দান করুন।












