ঢাকা ০৩:৫২ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬, ২৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নাজমা মনি 

এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বঞ্চনা— আর কত অপেক্ষা?

নাজমা মনি 
  • আপডেট সময় : ০৫:২৬:৫১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬ ৬ বার পড়া হয়েছে

এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বঞ্চনা— আর কত অপেক্ষা?

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার একটি বৃহৎ অংশ এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের  শিক্ষক-কর্মচারীদের শ্রম, মেধা ও আত্মত্যাগের ওপর প্রতিষ্ঠিত।
দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শুরু করে শহরাঞ্চলের লাখো শিক্ষার্থীর জ্ঞানচর্চা, নৈতিক বিকাশ ও মানবসম্পদ গঠনে তাঁদের অবদান অনস্বীকার্য। অথচ জাতি গঠনের এই কারিগররা দীর্ঘদিন ধরে নানা বৈষম্য ও বঞ্চনার শিকার হয়ে আসছেন।
একজন সরকারি শিক্ষক যে সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেন, এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা একই দায়িত্ব পালন করেও তার অনেকাংশ থেকে বঞ্চিত। শতভাগ উৎসব ভাতা, পর্যাপ্ত চিকিৎসা ভাতা, সরকারি বিধি অনুযায়ী বাড়িভাড়া, পিআরএল এবং পূর্ণাঙ্গ পেনশন সুবিধা আজও তাঁদের নাগালের বাইরে।
অথচ শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন দেখানো, তাদের মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা এবং দেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণে তাঁদের ভূমিকা কোনো অংশে কম নয়।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বাস্তবতা দেখা যায় অবসরের পর।
সারা জীবন শিক্ষা বিস্তারে নিবেদিত থাকার পরও একজন শিক্ষককে অবসরে গিয়ে তাঁর ন্যায্য পাওনার জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হয়। বর্তমানে প্রায় ৬৬ হাজার অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীর অবসর ভাতা ও কল্যাণ সুবিধার ফাইল নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। কেউ এখনও দপ্তরে দপ্তরে ঘুরছেন, কেউ চিকিৎসার অভাবে মানবেতর জীবনযাপন করছেন, আবার কেউ তাঁদের প্রাপ্য অর্থ হাতে পাওয়ার আগেই মৃত্যুবরণ করেছেন। এটি শুধু প্রশাসনিক জটিলতা নয়, এটি শিক্ষকদের প্রতি রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতার একটি বড় প্রশ্ন।
অবসরকালীন আর্থিক নিরাপত্তা একজন শিক্ষকের ন্যায্য অধিকার। কিন্তু বাস্তবতা হলো, দীর্ঘ কর্মজীবন শেষে অধিকাংশ এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীকে অনিশ্চিত অবসর ভাতা ও কল্যাণ ট্রাস্টের অর্থের আশায় দিন কাটাতে হয়।
একজন শিক্ষক অবসরে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর নিয়মিত আয় চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়, পক্ষান্তরে তার জীবনযাত্রা চিকিৎসা ও পারিবারিক দায়িত্ব বহাল থাকে। ফলে অনেকেই চরম আর্থিক সংকট ও অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবন অতিবাহিত করতে বাধ্য হন। জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় জাতির সন্তানদের জন্য উৎসর্গ করার পর বার্ধক্যে এসে এমন অনিশ্চয়তা নিঃসন্দেহে অমানবিক ও বেদনাদায়ক।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য অবসর বোর্ড ও কল্যাণ ট্রাস্টে জমে থাকা দাবিগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করা জরুরি। সংশ্লিষ্টদের মতে, এ খাতে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন। জাতীয় বাজেটে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ নিশ্চিত করা হলে হাজার হাজার অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীর দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটতে পারে এবং তাঁরা তাঁদের প্রাপ্য অধিকার ফিরে পেতে পারেন।
একই সঙ্গে সরকারি চাকরিজীবীদের ন্যায় এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য স্থায়ী পেনশন ব্যবস্থা চালু করা অত্যাবশকীয় এবং সময়ের  অপরিহার্য দাবি।
পেনশন একজন কর্মজীবী মানুষের দীর্ঘদিনের শ্রম, নিষ্ঠা ও অবদানের স্বীকৃতি।
যে শিক্ষক সারা জীবন জাতির ভবিষ্যৎ গঠনে নিজেকে উৎসর্গ করেছেন, তাঁর বার্ধক্য যেন আর্থিক অনিশ্চয়তা ও প্রাপ্য অর্থের অপেক্ষায় না কাটে—সেটি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব।
একটি উন্নত, জ্ঞানভিত্তিক ও মানবিক রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন তখনই বাস্তবায়িত হবে, যখন শিক্ষকদের ন্যায্য মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত করা হবে। তাই এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের শতভাগ উৎসব ভাতা, যথাযথ চিকিৎসা ভাতা, সরকারি নিয়মের বাড়িভাড়া, পিআরএল, পেনশন সুবিধা এবং অবসর ও কল্যাণ ভাতার দ্রুত নিষ্পত্তি নিশ্চিত করা এখন সময়ের জোরালো দাবি।
আমি মনে করি— শিক্ষকদের কল্যাণের উদ্দেশ্যে ব্যয় অন্যসব ব্যয়ের ন্যায় ব্যয় নয়, এটি জাতির ভবিষ্যতের জন্য একটি বিনিয়োগ।
যে রাষ্ট্র তার শিক্ষকদের সম্মানিত করে, সেই রাষ্ট্রই টেকসই উন্নয়ন, মানবিক মূল্যবোধ এবং সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যায়।
তাই রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের উচিত— এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের দাবিগুলোকে কেবল সহানুভূতির সঙ্গে নয় বরং তাঁদের ন্যায্য অধিকারের দৃষ্টিতে দেখা,এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
superadmin
ট্যাগস :

নাজমা মনি 

এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বঞ্চনা— আর কত অপেক্ষা?

আপডেট সময় : ০৫:২৬:৫১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬

এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বঞ্চনা— আর কত অপেক্ষা?

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার একটি বৃহৎ অংশ এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের  শিক্ষক-কর্মচারীদের শ্রম, মেধা ও আত্মত্যাগের ওপর প্রতিষ্ঠিত।
দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শুরু করে শহরাঞ্চলের লাখো শিক্ষার্থীর জ্ঞানচর্চা, নৈতিক বিকাশ ও মানবসম্পদ গঠনে তাঁদের অবদান অনস্বীকার্য। অথচ জাতি গঠনের এই কারিগররা দীর্ঘদিন ধরে নানা বৈষম্য ও বঞ্চনার শিকার হয়ে আসছেন।
একজন সরকারি শিক্ষক যে সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেন, এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা একই দায়িত্ব পালন করেও তার অনেকাংশ থেকে বঞ্চিত। শতভাগ উৎসব ভাতা, পর্যাপ্ত চিকিৎসা ভাতা, সরকারি বিধি অনুযায়ী বাড়িভাড়া, পিআরএল এবং পূর্ণাঙ্গ পেনশন সুবিধা আজও তাঁদের নাগালের বাইরে।
অথচ শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন দেখানো, তাদের মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা এবং দেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণে তাঁদের ভূমিকা কোনো অংশে কম নয়।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বাস্তবতা দেখা যায় অবসরের পর।
সারা জীবন শিক্ষা বিস্তারে নিবেদিত থাকার পরও একজন শিক্ষককে অবসরে গিয়ে তাঁর ন্যায্য পাওনার জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হয়। বর্তমানে প্রায় ৬৬ হাজার অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীর অবসর ভাতা ও কল্যাণ সুবিধার ফাইল নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। কেউ এখনও দপ্তরে দপ্তরে ঘুরছেন, কেউ চিকিৎসার অভাবে মানবেতর জীবনযাপন করছেন, আবার কেউ তাঁদের প্রাপ্য অর্থ হাতে পাওয়ার আগেই মৃত্যুবরণ করেছেন। এটি শুধু প্রশাসনিক জটিলতা নয়, এটি শিক্ষকদের প্রতি রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতার একটি বড় প্রশ্ন।
অবসরকালীন আর্থিক নিরাপত্তা একজন শিক্ষকের ন্যায্য অধিকার। কিন্তু বাস্তবতা হলো, দীর্ঘ কর্মজীবন শেষে অধিকাংশ এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীকে অনিশ্চিত অবসর ভাতা ও কল্যাণ ট্রাস্টের অর্থের আশায় দিন কাটাতে হয়।
একজন শিক্ষক অবসরে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর নিয়মিত আয় চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়, পক্ষান্তরে তার জীবনযাত্রা চিকিৎসা ও পারিবারিক দায়িত্ব বহাল থাকে। ফলে অনেকেই চরম আর্থিক সংকট ও অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবন অতিবাহিত করতে বাধ্য হন। জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় জাতির সন্তানদের জন্য উৎসর্গ করার পর বার্ধক্যে এসে এমন অনিশ্চয়তা নিঃসন্দেহে অমানবিক ও বেদনাদায়ক।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য অবসর বোর্ড ও কল্যাণ ট্রাস্টে জমে থাকা দাবিগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করা জরুরি। সংশ্লিষ্টদের মতে, এ খাতে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন। জাতীয় বাজেটে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ নিশ্চিত করা হলে হাজার হাজার অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীর দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটতে পারে এবং তাঁরা তাঁদের প্রাপ্য অধিকার ফিরে পেতে পারেন।
একই সঙ্গে সরকারি চাকরিজীবীদের ন্যায় এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য স্থায়ী পেনশন ব্যবস্থা চালু করা অত্যাবশকীয় এবং সময়ের  অপরিহার্য দাবি।
পেনশন একজন কর্মজীবী মানুষের দীর্ঘদিনের শ্রম, নিষ্ঠা ও অবদানের স্বীকৃতি।
যে শিক্ষক সারা জীবন জাতির ভবিষ্যৎ গঠনে নিজেকে উৎসর্গ করেছেন, তাঁর বার্ধক্য যেন আর্থিক অনিশ্চয়তা ও প্রাপ্য অর্থের অপেক্ষায় না কাটে—সেটি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব।
একটি উন্নত, জ্ঞানভিত্তিক ও মানবিক রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন তখনই বাস্তবায়িত হবে, যখন শিক্ষকদের ন্যায্য মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত করা হবে। তাই এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের শতভাগ উৎসব ভাতা, যথাযথ চিকিৎসা ভাতা, সরকারি নিয়মের বাড়িভাড়া, পিআরএল, পেনশন সুবিধা এবং অবসর ও কল্যাণ ভাতার দ্রুত নিষ্পত্তি নিশ্চিত করা এখন সময়ের জোরালো দাবি।
আমি মনে করি— শিক্ষকদের কল্যাণের উদ্দেশ্যে ব্যয় অন্যসব ব্যয়ের ন্যায় ব্যয় নয়, এটি জাতির ভবিষ্যতের জন্য একটি বিনিয়োগ।
যে রাষ্ট্র তার শিক্ষকদের সম্মানিত করে, সেই রাষ্ট্রই টেকসই উন্নয়ন, মানবিক মূল্যবোধ এবং সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যায়।
তাই রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের উচিত— এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের দাবিগুলোকে কেবল সহানুভূতির সঙ্গে নয় বরং তাঁদের ন্যায্য অধিকারের দৃষ্টিতে দেখা,এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা।